জহির শাহ্, বিজয়নগর প্রতিনিধিঃ
এটি শুধু একটি কুকুর নয়, এটি এক রাজবংশের নাম, যার রক্তে বাঘের গর্জন, শেয়ালের চাতুর্য আর মানুষের প্রতি এক নিখাদ ভালোবাসা। মুখটা যেন কাব্যের পংক্তি—শেয়ালের মতো লম্বাটে, চোখে দার্শনিকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, কান দুটো যেন নিখুঁত রাডার, আর চেহারায় এমন এক দুর্দমনীয় আকর্ষণ, যা যুদ্ধের ময়দান থেকে কবিতার বই পর্যন্ত দখল করে নিতে পারে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল নামক জনপদের গর্ভে জন্ম নেওয়া এই গ্রে-হাউন্ড জাতের কুকুর এককালে ছিল বিশ্বজয়ের প্রতীক—আজ তা বিলুপ্তির কিনারায় দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে, যেন কোনো উপেক্ষিত সম্রাট নিজের হারিয়ে যাওয়া সিংহাসনের জন্য হাহাকার করছে। শিয়াল, বনবিড়াল, এমনকি বাঘদাসও এদের তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তি, নিপুণ গতি ও প্রাণান্ত তাড়া থেকে বাঁচতে পারে না—চোর ডাকাতদের তো নাম শুনলেই গলা শুকিয়ে যায়। অথচ এই শিকারি প্রাণীদের আত্মা নিয়ে গঠিত কুকুরটি আজ নিজেই শিকার—প্রশিক্ষণহীনতা, সরকারি অনাগ্রহ, বাজারি অবহেলা ও দারিদ্র্যের ছোবলে। বহু যুগ আগে কোনো এক দেওয়ান নাকি তার রাজহাতির বিনিময়ে এই কুকুরকে এনেছিলেন, আবার কেউ বলেন শিকারের সময় বাঘের সঙ্গে মিলনের ফলেই এর জন্ম—যাই হোক ইতিহাস যেভাবেই হোক, বাস্তবতা হলো, সরাইলের আকাশে এই কুকুরের ডাকে যে আত্মবিশ্বাসের শব্দ ছিল, তা আজ নিভে যাচ্ছে এক একটি নিঃশ্বাসে।
আগে যেখানে উপজেলার প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এই কুকুর পাহারা দিত, আজ সেখানে একমাত্র নোয়াগাঁও গ্রামের অজিত লাল দাসের মতো নিবেদিতপ্রাণ কয়েকজন মানুষই কায়ক্লেশে ধরে রেখেছেন ইতিহাসের শেষ শ্বাস। অজিত লাল দাসের বাড়িতে এখনো আছে বিশটি কুকুর, যাদের নাম টাইগার, মধু, কালী, পপি—যেন একেকটা চরিত্র, একেকটা উপন্যাস। এই কুকুরদের খাবার খরচ, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, সবই এখন চরম কষ্টসাধ্য—একেকটা বাচ্চা কুকুরের জন্য প্রতিদিন দুই লিটার দুধ লাগে, উন্নত খাবার দিতে হয় যাতে দাম ওঠে ২০-২৫ হাজার টাকা, বড়দের দাম ৬০-৬৫ হাজার—কিন্তু সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ যেন আজ এক অবহেলিত সংগ্রাম। চোর ডাকাতের ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারেন না পালনকারীরা, তবু ভালোবাসা হারান না। প্রশ্ন হলো—সরকার কি শুনছে এই হাহাকার? কেউ যদি এদের অস্তিত্ব রক্ষা না করে, তবে অচিরেই সরাইলের ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাবে এই শিকারি মহারাজ, পৃথিবীর আরেকটি দুর্লভ প্রাণী নাম লেখাবে ‘বিলুপ্ত’ তালিকায়। অথচ এ কুকুর শুধু প্রজাতি নয়, এটি এক ঐতিহ্য, এক সংস্কৃতি, এক প্রতিরোধের প্রতীক—যা আমাদের পরিচয়, যা আমাদের আত্মমর্যাদা। সরাইলের ইউএনও মো. মোশারফ হোসাইন আশ্বাস দিয়েছেন একটি প্রজনন কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনার কথা—কিন্তু তা যদি বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে হাজার বছরের ইতিহাস হবে শুধুই স্মৃতির কবর। আজ প্রয়োজন সাংবাদিকতা নয়, প্রয়োজন আত্মার চিৎকার—এই কুকুর রক্ষা করো, রক্ষা করো তোমার দেশ, তোমার ইতিহাস, তোমার বুকের ভেতর শিকারের রক্তভেজা গর্জন। সরাইলের গ্রে-হাউন্ড কুকুর, তুমি যদি নিঃশেষ হয়ে যাও, আমাদের সাহসও নিঃশেষ হয়ে যাবে। এখনো সময় আছে, বিপ্লব তো শুরু হোক!