জহির শাহ্ , বিজয়নগর প্রতিনিধিঃ
একটি শহর, একটি সুরের কাহিনি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া—একটি নাম, যা প্রথম শুনলে মনে পড়ে সীমান্তের কাছাকাছি একটি জনবহুল শহরের ছবি: ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানবাহনের গর্জন, আখাউড়ার ট্রেনের শিস, আর বাজারের কোলাহল। কিন্তু এই শহরের বুকে লুকিয়ে আছে এক অমর সুরের গল্প, যা এটিকে কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতের পবিত্র তীর্থভূমিতে রূপান্তরিত করেছে। এই মাটিতে জন্মেছিলেন উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ—এক মহান সংগীত সাধক, যাঁর সরোদের সুর আর অতুলনীয় সাধনা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাইহার ঘরানা যেন এক জ্যোতির্ময় মশাল, যা পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উস্তাদ আলী আকবর খাঁ’র মতো কিংবদন্তিদের হাত ধরে বিশ্বজুড়ে আলো ছড়িয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিটি পথ, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ঘর যেন সেই সুরের সাক্ষী, যা এই শহরকে সংগীতের এক অমর নগরীতে পরিণত করেছে।
এই প্রতিবেদনে আমরা অনুসন্ধান করব, কেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শুধু একটি শহর নয়, বরং সুরের এক পুণ্যভূমি।
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সুরের স্রষ্টা, সাধনার প্রতীক।
১৮৬২ সালে শিবপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন সংগীতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর জীবন ছিল সুরের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ও অক্লান্ত সাধনার এক মহাকাব্য। শৈশবে সংগীতের প্রতি তাঁর টান ছিল এমন এক আবেগ, যা তাঁকে ঘর ছেড়ে পথে নামিয়েছিল। কোলকাতার সঙ্গীতাঙ্গন থেকে মাইহারের রাজদরবার—তাঁর যাত্রা ছিল এক সংগীত তীর্থযাত্রা। মাইহারে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের ঘরানা—মাইহার ঘরানা, যা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
তিনি ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভা। সরোদ, সেতার, বাঁশি, তবলা—একাধিক যন্ত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। তিনি শুধু বাজাতেন না, নতুন যন্ত্র তৈরি ও পরিমার্জন করতেন, যেগুলোর ধ্বনি বিশ্বমঞ্চে আজও প্রতিধ্বনিত। তাঁর হাতে রাগের বিন্যাসে এসেছে নতুন প্রাণ, যন্ত্রসংগীত পেয়েছে অভিনব গভীরতা। তাঁর শিষ্য পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উস্তাদ আলী আকবর খাঁ, আমজাদ আলী খানের মতো মহারথীরা তাঁর দর্শনকে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন সংগীতের এক স্রষ্টা, যাঁর সুরে মিশে ছিল আধ্যাত্মিকতা, আর যাঁর সাধনা ছিল বিশ্বসংগীতের এক অমর আলো।
সঙ্গীতাঙ্গন: এক সুরের তীর্থক্ষেত্র
শিবপুরে উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পৈতৃক ভিটায় অবস্থিত ‘উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন’ কেবল একটি স্মৃতিসৌধ নয়, এটি সুরের এক জীবন্ত মন্দির। এখানে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে তাঁর ব্যবহৃত সরোদ, সেতার, তানপুরার মতো অমূল্য যন্ত্র, যেগুলো যেন এখনও তাঁর স্পর্শের উষ্ণতা ধরে রেখেছে। এই সঙ্গীতাঙ্গন বিশ্বের সংগীতপ্রেমীদের কাছে এক তীর্থস্থান, যেখানে তারা এসে অনুভব করে সেই সুরের মায়া, যা উস্তাদের হাতে জন্ম নিয়েছিল।
এখানে নিয়মিত আয়োজিত হয় সংগীত উৎসব, কর্মশালা, সেমিনার, যেখানে দেশ-বিদেশের শিল্পীরা মিলিত হন। এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যা উস্তাদের দর্শনকে বাঁচিয়ে রাখে। এই সঙ্গীতাঙ্গন বাংলাদেশের সংগীতচর্চার এক প্রাণকেন্দ্র, যেখানে প্রতিটি নোট, প্রতিটি ধ্বনি যেন উস্তাদের উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুর: এক অমর ঐতিহ্য।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেন সংগীতের এক জিনগত উত্তরাধিকার। এই শহরের মাটিতে শুধু উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ নন, জন্ম নিয়েছেন তাঁর ভাই উস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, ছেলে উস্তাদ আলী আকবর খাঁ, ভাইপো উস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান, নাতি উস্তাদ খুরশীদ খান—প্রত্যেকেই সংগীত জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই শহরের পরিবেশ, সংস্কৃতি, পরিবারগুলো যেন সুরের একেকটি কারখানা, যেখানে প্রতিটি শ্বাসে মিশে আছে রাগের আলাপ, প্রতিটি হৃদস্পন্দনে বাজে তালের ছন্দ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া তাই কেবল একটি শহর নয়, এটি সংগীতের এক প্রাণকেন্দ্র, যেখান থেকে উৎসারিত হয়েছে বিশ্বজয়ী সুরের ধারা।
বিশ্বমঞ্চে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধ্বনিঃ
উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুর পৌঁছে গেছে বিশ্বের প্রতিটি কোণে। পণ্ডিত রবিশঙ্করের সেতার, আলী আকবর খাঁ’র সরোদ, আমজাদ আলী খানের সুর বিশ্বের সংগীতপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে। টোকিওর কনসার্ট হল থেকে লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হল, নিউ ইয়র্কের কার্নেগি হল—এই শহরের সুর বিশ্বের মঞ্চে প্রতিধ্বনিত। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর জীবন নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, তাঁর সুর নিয়ে তৈরি হচ্ছে সিনেমা, ডকুমেন্টারি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া তাই কেবল একটি নাম নয়, এটি সংগীতের এক সার্বজনীন ভাষা।
ভবিষ্যতের পথ ও আমাদের দায়িত্ব
উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতি ও উত্তরাধিকার আজ অবহেলার ছায়ায় ম্লান হতে বসেছে। এখনই সময় এই মহান সাধকের অবদানকে পুনরুজ্জীবিত করার।
আমাদের করণীয়:
১. আন্তর্জাতিক সংগীত বিশ্ববিদ্যালয়: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, যেখানে সংগীত শিক্ষা হবে বিশ্বমানের।
২. বিশ্ব সংগীত উৎসব: প্রতি বছর একটি আন্তর্জাতিক সংগীত উৎসব, যেখানে বিশ্বের শিল্পীরা মিলিত হবেন।
৩. সঙ্গীত আর্কাইভ: ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ‘সঙ্গীত নগরী’ ঘোষণা করে একটি স্থায়ী আর্কাইভ ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা।
৪. তরুণদের সম্পৃক্ততা: স্কুল-কলেজে সংগীত শিক্ষা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে সুরের পথে আনা।
উপসংহার: সুরের অমর নগরী।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেবল একটি শহর নয়, এটি সুরের এক অমর কাব্য। উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন সেই কবি, যাঁর সুরে জেগে উঠেছিল উপমহাদেশের সংগীত। তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে সেই সুর আজও বিশ্বে বাজছে। আমাদের দায়িত্ব এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখা, নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে সঙ্গীতনগরী হিসেবে গড়ে তুলে আমরা যদি নতুন উস্তাদদের জন্ম দিতে পারি, তবেই উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা পূর্ণ হবে। এই শহরের প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি বাতাস যেন গাইছে—ব্রাহ্মণবাড়িয়া সুরের তীর্থ, আমাদের চিরন্তন গর্ব।