জহির শাহ্,বিজয়নগর প্রতিনিধি:
গণতন্ত্র নামক মহীরুহের মূল প্রোথিত থাকে জনগণের আস্থার মাটিতে, আর সেই আস্থাকে সিঞ্চিত করার প্রধান স্রোত হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। এই পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই জন্ম হয়েছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের (ইসি), যা সংবিধান অনুযায়ী এক স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। এর কাজ শুধু ব্যালট বাক্স পাহারা দেওয়া নয়, বরং জনগণের ইচ্ছার সঠিক প্রতিফলন ঘটানো; রাষ্ট্রপতি নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা। সংবিধানের সপ্তম ভাগে, ১১৮ থেকে ১২৬ অনুচ্ছেদের পরতে পরতে এই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে প্রায় অসীম ক্ষমতা ও স্বাধীনতা। সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অনধিক চারজন কমিশনারকে নিয়ে এর গঠন, যাদের নিয়োগের ভার স্বয়ং রাষ্ট্রপতির ওপর। ১১৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তাদের পাঁচ বছরের মেয়াদকালে তারা প্রজাতন্ত্রের অন্য কোনো পদে আসীন হতে পারবেন না, যা তাদের নিরপেক্ষতার এক বড় রক্ষাকবচ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ১১৮(৪) অনুচ্ছেদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করে, “নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনে স্বাধীন থাকিবে এবং কেবল সংবিধান ও আইনের অধীন হইবে”। এই স্বাধীনতাকে কাগজে-কলমে আরও মজবুত করতে প্রণীত হয়েছে ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন, ২০০৯’, যা কমিশনকে দিয়েছে নিজস্ব প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার অধিকার। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে এসেছে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২’। এই আইন অনুযায়ী, আপিল বিভাগের একজন বিচারককে সভাপতি করে ছয় সদস্যের একটি অনুসন্ধান (সার্চ) কমিটি গঠিত হবে, যেখানে হাইকোর্ট বিভাগের আরেকজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুজন বিশিষ্ট নাগরিক (একজন নারীসহ) থাকবেন।
এই কমিটি ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ১০ জন যোগ্য ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করবে এবং সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত নিয়োগ দেবেন। এই সব আইন ও সাংবিধানিক বিধানের দিকে তাকালে মনে হয়, এ যেন এক দুর্ভেদ্য দুর্গ, যা যেকোনো রাজনৈতিক ঝড়ে অটল থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা যখন সেই আইনি বর্ম ভেদ করে কঙ্কালসার চেহারাটা দেখিয়ে দেয়, তখন জনগণের স্বপ্নভঙ্গ হওয়াই স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ সেই স্বপ্নভঙ্গেরই প্রতিধ্বনি, যা প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে এমন এক খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে ফিরে আসাটা অত্যন্ত কঠিন।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে বিতর্ক, তা আজ আর কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুমের আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো যেন এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে। এই নির্বাচনগুলোকে কেন্দ্র করে সংবিধান লঙ্ঘন ও ভয়াবহ অনিয়মের যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা প্রতিষ্ঠানটির গায়ে এক স্থায়ী কলঙ্কের দাগ এঁকে দিয়েছে। যখন দেশের সিংহভাগ মানুষ নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং ভোটের ফলাফল নিয়ে জনমনে সংশয়ের কালো মেঘ জমে, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে গেছে। এই অনাস্থার পারদ আরও চড়েছে, যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোর অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আরও ১৯ জনের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি জলজ্যান্ত প্রশ্ন—দেশের শাসনব্যবস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিরা যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকের ভোটের নিরাপত্তা কোথায়? সংবিধান যেখানে কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দিয়েছে, সেখানে এই ধরনের ঘটনা সেই স্বাধীনতারই চরম অবমাননা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে খোদ কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে আমলাদের ওপর উদ্বেগজনক নির্ভরতা দেখা গেছে।
একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার নিরপেক্ষ থাকার কথা, সেটি যখন নির্দিষ্ট কোনো পেশাগত গোষ্ঠীর দ্বারা প্রভাবিত বা পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, তখন তার কাছ থেকে সব রাজনৈতিক দল ও মতের জন্য সমান ক্ষেত্র (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করার আশা করাটা বাতুলতা মাত্র। এই ‘আমলা-নির্ভরতা’ এমন এক শঙ্কার জন্ম দিয়েছে যে, কমিশন হয়তো তার সাংবিধানিক পরিচয়ের চেয়ে প্রশাসনিক পরিচয়কেই বেশি গুরুত্ব দেবে, যা নিরপেক্ষ নির্বাচনের ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই প্রশ্নগুলো আজ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সামনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে—নির্বাচন কমিশন কি জনগণের প্রহরী, নাকি অন্য কারো আজ্ঞাবাহী?
রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কাঠামো এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়েও উঠেছে गंभीर প্রশ্ন। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে একটি পোস্টে প্রকাশিত এক অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন কোনো প্রকার নীতিমালা ছাড়াই প্রশিক্ষণের নামে জনগণের করের সাড়ে সাত কোটি টাকা ক্ষতি করেছে। এটি কোনো ছোট অঙ্ক নয়। এই অর্থ দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শত শত ভোটকেন্দ্রকে আধুনিকায়ন করা যেত, ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো যেত, অথবা নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় জড়িত অস্থায়ী কর্মীদের সম্মানী বাড়ানো যেত। যখন জনগণের অর্থ এমন জবাবদিহিহীনভাবে খরচ হয়, তখন তা কেবল আর্থিক দুর্নীতিই নয়, এটি জনগণের আস্থার প্রতি এক চরম উপহাস। এই একটি ঘটনাই নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সুশাসন, দক্ষতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে বিরাট এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি করেছে। প্রশাসনিক দুর্বলতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয় কমিশনের সাংগঠনিক কাঠামো ও কর্মকর্তাদের বদলির অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া দেখলে। যখন কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদায়ন বা বদলির ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না, তখন সেখানে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি হয়। একজন কর্মকর্তা যদি তার কাজের মূল্যায়নের পরিবর্তে অন্য কোনো উপায়ে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ খোঁজেন, তবে তার কাছ থেকে নিরপেক্ষ ও নির্ভীক দায়িত্ব পালন আশা করা যায় না।
এই প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা ও দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সংক্রমিত হয়। তফসিল ঘোষণা, ভোট গ্রহণ এবং ফলাফল ঘোষণার মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়াগুলোতেও স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ উঠেছে বারবার। বিশেষ করে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের হলফনামা এবং ভোটকেন্দ্রের গেজেট প্রকাশে যে বিলম্ব ঘটেছিল, তা জনমনে ব্যাপক সন্দেহের জন্ম দেয়। তথ্য জানার অধিকার নাগরিকের একটি মৌলিক অধিকার, আর নির্বাচনী তথ্য হলো গণতন্ত্রের স্বচ্ছতার প্রাণ। সেই তথ্য প্রকাশে গড়িমসি করার অর্থ হলো, জনগণের কাছ থেকে কিছু আড়াল করার চেষ্টা। ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২’-এর ৪ ও ৫ ধারা অনুযায়ী, দেশের সকল নির্বাহী বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করতে আইনত বাধ্য। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানের নিজের ঘরেই স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলার এমন অভাব, সে বাইরের প্রতিষ্ঠান থেকে কতটা কার্যকর সহায়তা ও সম্মান আদায় করতে পারবে? এই ছোট ছোট প্রশাসনিক ত্রুটি আর অস্বচ্ছতাই ধীরে ধীরে জমে এক বিশাল অনাস্থার পাহাড়ে পরিণত হয়েছে, যার নিচে চাপা পড়েছে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার।
তবে ঘোর অমানিশার মধ্যেও ভোরের আলোর রেখা কখনও কখনও দেখা যায়। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের কিছু পদক্ষেপকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সংস্কারের একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’ জারি করা হয়েছে। এই নীতিমালার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো, ভোটকেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত কমিটি থেকে জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং পুলিশ সুপার (এসপি)-কে বাদ দেওয়া। এই সিদ্ধান্তটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল যে মাটপর্যায়ের প্রশাসনিক ও পুলিশের কর্মকর্তারা সরাসরি নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত থাকায় একটি ভীতির পরিবেশ তৈরি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকে। এই কমিটি বিলুপ্ত করার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন হয়তো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে যতটা সম্ভব বেসামরিক ও প্রভাবমুক্ত রাখার একটি বার্তা দিতে চেয়েছে, যা স্বচ্ছতা বৃদ্ধির পথে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এছাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নকে (চান্দুরা, বুধন্তী ও হরষপুর) পার্শ্ববর্তী অন্য একটি আসনের সাথে যুক্ত করার ঘটনাটিও নির্বাচন কমিশনের সক্রিয়তার একটি উদাহরণ, যদিও এই সীমানা পুনর্নির্ধারণ স্থানীয়ভাবে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের মতো জটিল কাজগুলো সম্পাদন করছে। জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির প্রচেষ্টাও দৃশ্যমান। সপ্তম জাতীয় ভোটার দিবস-২০২৫ উপলক্ষে কমিশনের স্লোগান ছিল “তোমার আমার বাংলাদেশে, ভোট দিব মিলেমিশে”। এ ধরনের আকর্ষণীয় স্লোগান নিঃসন্দেহে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি হলো, এই বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপগুলো এবং সুন্দর স্লোগান কি কমিশনের ওপর জনগণের হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট? বিশ্বাস কথার ফুলঝুরিতে তৈরি হয় না, বিশ্বাস তৈরি হয় কাজে। যখন একজন ভোটার নিশ্চিত হবেন যে, তার দেওয়া একটিমাত্র ভোটেরও মূল্য আছে, সেটি সঠিকভাবে গণনা করা হবে এবং তার রায়ের মাধ্যমেই ক্ষমতার পরিবর্তন হতে পারে—কেবল তখনই তিনি সকল ভয় ও শঙ্কা উপেক্ষা করে ভোটকেন্দ্রে যাবেন। তাই এই ইতিবাচক উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা তখনই প্রমাণিত হবে, যখন এগুলো একটি সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হবে। এর জন্য প্রয়োজন আরও গভীর ও মৌলিক কিছু পরিবর্তন। ভোটার তালিকা প্রণয়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে এটিকে শতভাগ স্বচ্ছ করতে হবে। ভোটারদের সম্মতি ও স্বাক্ষর যাচাইয়ের জন্য কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো, নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াকে ঢেলে সাজানো। সার্চ কমিটিতে কেবল নির্ধারিত কয়েকটি পদের ব্যক্তিদের না রেখে, সেখানে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা ভাবতে হবে, যাতে কমিশনের গঠন শুরু থেকেই একটি সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পায়। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতিটি তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে অনলাইনে প্রকাশের মাধ্যমে ডিজিটাল জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আর প্রশিক্ষণের নামে অর্থ লোপাটের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর আর্থিক নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মতো স্বাধীন সংস্থার সাথে সমন্বয় করে কাজ করলে আর্থিক স্বচ্ছতা আনা সহজতর হবে।
পরিশেষে, একথা বলতেই হয় যে, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন এক অন্তিম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সংবিধান কর্তৃক অসীম ক্ষমতা ও স্বাধীনতার আইনি মহিমা, অন্যদিকে জনগণের তীব্র অনাস্থা ও লাগাতার অভিযোগের কঠিন বাস্তবতা। ভোটার তালিকায় অনিয়ম, নির্বাচনে পক্ষপাতমূলক আচরণ, আর্থিক অস্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার মতো বিষয়গুলো এই প্রতিষ্ঠানটির ঔজ্জ্বল্যকে ম্লান করে দিয়েছে। আইন ও সংবিধানের শক্তিশালী কাঠামো থাকা সত্ত্বেও তার সঠিক ও সৎ প্রয়োগের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি আজ তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে বসেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নতুন সার্চ কমিটি গঠন এবং নভেম্বরে নতুন কমিশনের শপথ গ্রহণ—এই সবই হয়তো আইনি প্রক্রিয়া মেনেই সম্পন্ন হয়েছে।
কিন্তু আইন মানা আর আইনের আত্মাকে ধারণ করা এক জিনিস নয়। আইনের আত্মা হলো একটি সত্যিকারের নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী কমিশন প্রতিষ্ঠা করা, যা সকল ভয় ও অনুরাগের ঊর্ধ্বে থেকে শুধু সংবিধান ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। সেই আত্মা কি এই প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করে দেবে। কমিশনকে বুঝতে হবে, তারা কোনো সাধারণ সরকারি দপ্তর নয়; তারা গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। এই বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে হলে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং দক্ষতার প্রমাণ দিয়েই করতে হবে। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা জনগণের পবিত্র আমানত, অর্থাৎ ভোটের সত্যিকারের প্রহরী। নইলে, গণতন্ত্রের নামে যা টিকে থাকবে, তা হবে কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা, একটি প্রহসন—আর সেই প্রহসনের মঞ্চে জনগণ থাকবে অসহায়, নীরব দর্শকের ভূমিকায়। এই নীরবতার সংস্কৃতি ভেঙে একটি জীবন্ত ও কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দায়ভার আজ আমাদের সকলের।
https://shorturl.fm/V9Lvd