সাংবাদিকদের উপর মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি।

জহির শাহ্, বিজয়নগর প্রতিনিধি,

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার মাটিতে, যেখানে সীমান্তের হাওয়া মানুষের স্বপ্নের গল্প বয়ে আনে, সেখানে এখন সত্যের কণ্ঠরোধের এক নির্মম ষড়যন্ত্র চলছে। দুই সাহসী সাংবাদিক—দৈনিক যুগান্তরের জেলা স্টাফ রিপোর্টার মো. ফজলে রাব্বি এবং আরটিভির আখাউড়া প্রতিনিধি মো. সাদ্দাম হোসেন—যারা আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ঘুষ বাণিজ্য ও যাত্রী হয়রানির কালো সত্যগুলো তুলে ধরেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে এক মিথ্যা মামলা। এই মামলা শুধু তাদের বিরুদ্ধে নয়, এটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতার উপর এক নির্লজ্জ আঘাত, এটি জনগণের জানার অধিকারের উপর হামলা। মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট ২০২৫, বিকেল ৪টার দিকে, আখাউড়ার সাংবাদিক সমাজ এই অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। তারা স্বরাষ্ট্র ও তথ্য উপদেষ্টার কাছে একটি স্মারকলিপি পাঠিয়েছে, আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতীশ দর্শী চাকমার মাধ্যমে। এই স্মারকলিপিতে তারা দাবি করেছে—এই মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হোক, ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার এবং আখাউড়া থানার ওসি মো. ছমিউদ্দিনকে অপসারণ করা হোক, এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এই ঘটনা কেবল দুই সাংবাদিকের গল্প নয়, এটি একটি জাতির বিবেকের প্রশ্ন, একটি দেশের সত্যের পথে হাঁটার সংগ্রাম।

গত ৪ আগস্ট আরটিভি অনলাইনে এবং ৭ আগস্ট দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল আখাউড়া ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে ঘুষ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, মেডিকেল ভিসায় ভারতে যাওয়া যাত্রীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কে ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। টাকা না দিলে যাত্রীদের সীমান্ত পারাপার বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এই ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন ইমিগ্রেশনের ওসি মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রহিম, এবং কনস্টেবল দেলোয়ার হোসেন। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরই, ১২ আগস্ট, ওসি আব্দুস সাত্তার বাদী হয়ে ফজলে রাব্বি ও সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও মানহানির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। তিনি দাবি করেন, সাংবাদিকরা তার কাছে ইফতারের জন্য চাঁদা চেয়েছিলেন, যা প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই মামলাকে সাংবাদিক সমাজ ‘হয়রানিমূলক’ এবং ‘সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধের চেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ফজলে রাব্বি বলেন, “আমরা পেশাগত দায়িত্ব থেকে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করেছি। এই মামলা সত্যকে আড়াল করার একটি ষড়যন্ত্র।” আখাউড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি শাহাদাত হোসেন লিটন বলেন, “সাংবাদিকরা জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করে।

দুর্নীতির খবর প্রকাশের কারণে তাদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো হচ্ছে। এটি গণতন্ত্রের উপর আঘাত।” টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “ইমিগ্রেশন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। এখানে দুর্নীতি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। সাংবাদিকদের মামলায় ফাঁসানো স্বাধীন সাংবাদিকতার উপর হস্তক্ষেপ।” রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি রুবেল আহমেদ বলেন, “আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি—এই মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হোক, দায়ীদের অপসারণ করা হোক, এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।” গত ১৫ আগস্ট, আখাউড়ার পৌর মুক্তমঞ্চের সামনে সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের ব্যানারে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মামলা প্রত্যাহার এবং দুই ওসির অপসারণের দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, “ঘুষ বাণিজ্য তদন্তের পরিবর্তে সাংবাদিকদের মামলায় জড়ানো স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী।” মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল মনসুর মিশন, পৌর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রহমান কাশগরি, দৈনিক যুগান্তরের জেলা প্রতিনিধি সোহরাব হোসেন, এবং আরও অনেকে। আখাউড়া সাংবাদিক কল্যাণ সোসাইটির সভাপতি নাসির উদ্দিন বলেন, “দুর্নীতি প্রকাশ করলেই যদি মামলা হয়, তাহলে সত্য কীভাবে প্রকাশ পাবে? আমরা সাংবাদিকদের পাশে আছি।” এই ঘটনা শুধু আখাউড়ার নয়, এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়। সাংবাদিকরা যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলম ধরেন, তখন তাদের উপর মিথ্যা মামলার খড়গ নেমে আসে। এটি কেবল ফজলে রাব্বি ও সাদ্দাম হোসেনের গল্প নয়, এটি প্রতিটি সাংবাদিকের সংগ্রাম, প্রতিটি নাগরিকের জানার অধিকারের লড়াই। আখাউড়ার ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে যে দুর্নীতি চলছে, তা দেশের মানুষের জন্য কলঙ্ক। যাত্রীরা যখন ভারতে চিকিৎসার জন্য যান, তখন তাদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। এই অর্থ তাদের পকেটে যাচ্ছে, যারা ক্ষমতার আড়ালে বসে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। সাংবাদিকরা এই সত্য তুলে ধরেছেন, কিন্তু তাদের পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন মিথ্যা মামলা। এই ঘটনা আমাদের সবাইকে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে—আমরা কি এমন একটি দেশ চাই, যেখানে সত্য বলার জন্য শাস্তি পেতে হয়? আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে দুর্নীতি আড়াল করতে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করা হয়? ইউএনও অতীশ দর্শী চাকমা বলেন, “সাংবাদিকদের স্মারকলিপি আমি গুরুত্বের সঙ্গে উপরে পৌঁছে দেব।” কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি কি যথেষ্ট? সরকারের কাছে এখন প্রশ্ন—তারা কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াবে, নাকি দুর্নীতির আড়ালে থাকা ক্ষমতাধরদের পক্ষ নেবে? এই ঘটনা শুধু আখাউড়ার নয়, এটি গোটা বাংলাদেশের জন্য একটি পরীক্ষা। সাংবাদিকতা যদি মরে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের হৃৎপিণ্ড থেমে যাবে। ফজলে রাব্বি ও সাদ্দাম হোসেনের এই লড়াই আমাদের সবার লড়াই। তাদের কলম যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ছে, তখন আমরা কি চুপ করে থাকব? এই স্মারকলিপি কেবল কাগজের টুকরো নয়, এটি সত্যের জন্য একটি মিছিল, এটি জনগণের জানার অধিকারের জন্য একটি হুঙ্কার। আমরা দাবি করছি—মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হোক, দুর্নীতিবাজদের বিচার করা হোক, এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হোক। এই লড়াই শুধু আখাউড়ার নয়, এটি প্রতিটি বাঙালির লড়াই, প্রতিটি সত্যপ্রিয় মানুষের লড়াই।

Please follow and like us:
0
fb-share-icon20
Tweet 20
Pin Share20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *