নাসিরনগরে আইএলএসটি শিক্ষার্থীদের শাটডাউন কর্মসূচি: নিয়োগ কাঠামোর অস্পষ্টতা ও কোর্স বৈধতা প্রশ্নে নীতিগত সংস্কারের দাবি

জহির শাহ্, বার্তা সম্পাদক

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (আইএলএসটি) ক্যাম্পাসে নিয়োগসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ও শিক্ষাক্রমের বৈধতা প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রোববার (২১ ডিসেম্বর) পূর্ণাঙ্গ আন্দোলনের রূপ নেয়। দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে ক্যাম্পাস শাটডাউন ঘোষণা করেন এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে তাদের দাবিসমূহ জনসমক্ষে উপস্থাপন করেন।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শিক্ষার্থী মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম সৈকত, হামিম ইসলাম, তাহমিদ নিশাত, জিহাদুল গাজী, আবদুল আউয়াল আবিরসহ অন্যান্য প্রতিনিধিরা। বক্তারা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত ভেটেরিনারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলোতে (ভিটিআই) পেশাজীবীদের জন্য চালু ডিপ্লোমা কোর্সগুলোকে বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে উল্লেখ করে সেগুলো অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান। একই সঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিয়োগ বিধিমালা–২০২৩ সংশোধন করে সকল সাব-টেকনিক্যাল পদে ‘ডিপ্লোমা ইন লাইভস্টক’ ডিগ্রিধারীদের একক নিয়োগযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির আহ্বান জানান তারা।
শিক্ষার্থীরা জানান, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লিখিত প্রজ্ঞাপন জারি না হলে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ চলমান শাটডাউন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হবে।
এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬ সালে সরকার প্রাণিসম্পদ খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে আইএলএসটি প্রতিষ্ঠানসমূহ চালু করে। এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য চার বছর মেয়াদি ‘ডিপ্লোমা ইন লাইভস্টক’ কোর্স প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মাঠপর্যায়ে দক্ষ কর্মী তৈরি করা এবং পূর্বে উচ্চমাধ্যমিক পাস কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ব্যয়ের চাপ কমানো।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ২০২৩ সালের নিয়োগ বিধিমালায় এই ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পদ নির্ধারণ না করায় তারা কার্যত বেকারত্বের মুখে পড়ছেন। পূর্ববর্তী বিধি অনুসরণ করে উপ-সহকারী লাইভস্টক অফিসার, ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্টসহ বিভিন্ন সাব-টেকনিক্যাল পদে সাধারণ নিয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় ডিপ্লোমা ইন লাইভস্টক সম্পন্নকারীরা কাঠামোগতভাবে প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাচ্ছেন।
এ ছাড়া ভিটিআইগুলোতে চালু কিছু কোর্সকে শিক্ষার্থীরা এই সংকটের অন্যতম সহায়ক কারণ হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষ্যে, সমান্তরাল ও নীতিগতভাবে অস্পষ্ট প্রশিক্ষণ কাঠামো মূল ডিপ্লোমা প্রোগ্রামের কর্মসংস্থান সম্ভাবনাকে দুর্বল করছে।
উল্লেখ্য, একই দাবিতে এর আগেও নাসিরনগরে সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। সে সময় উপজেলা প্রশাসনের আশ্বাসে আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত থাকলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় পুনরায় কর্মসূচি শুরু হয়েছে। একই ইস্যুতে নেত্রকোনা, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন আইএলএসটি ক্যাম্পাসেও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কর্মসূচির খবর পাওয়া গেছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, চার বছরের দীর্ঘ ও কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পরও নিয়োগ কাঠামোয় অগ্রাধিকার না থাকায় তারা সরকারি নীতিগত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ার অনুভূতি থেকে এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অতীতে প্রদত্ত আশ্বাসের আলোকে বিধিমালা সংশোধনের প্রত্যাশা থাকলেও তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় অসন্তোষ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইএলএসটি কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোকে যৌক্তিক হিসেবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে অবহিত করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ পায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের দ্রুত ও কাঠামোগত সমাধান না হলে প্রাণিসম্পদ খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি হতাশা তৈরি হতে পারে। তারা মনে করেন, সরকারের উচিত অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিত সংলাপের মাধ্যমে নিয়োগ বিধিমালা ও প্রশিক্ষণ কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করে একটি স্পষ্ট ও টেকসই নীতিগত সমাধানে পৌঁছানো, যাতে প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন ও মানবসম্পদ পরিকল্পনা সমান্তরালভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

Please follow and like us:
0
fb-share-icon20
Tweet 20
Pin Share20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *