জহির শাহ্
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আকাশে যেন হঠাৎ করেই নেমে এসেছে এক ঘন অন্ধকার। একটি ছোট্ট প্রাণ—নিশাত জাহান—যার পৃথিবী ছিল কেবল খেলা, হাসি আর মায়ের আঁচল, সেই জীবন নিভে গেল এক বিকৃত মানসিকতার নির্মম আঘাতে। ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজের নিরাপত্তা, নৈতিকতা এবং মানবিকতার গভীর সংকটকে নগ্ন করে দিয়েছে।
সদর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের বাসিন্দা, প্রবাসী আবু সাদেক মিয়ার ছয় বছর বয়সী মেয়ে নিশাত স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনের নার্সারি শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৫ এপ্রিল বিকেলে বাড়ির পাশের দোকান থেকে চিপস কিনতে বের হয়ে আর ফেরেনি সে। পরিবারের আকুল অনুসন্ধান, আত্মীয়স্বজনের দৌড়ঝাঁপ—সবকিছুই ব্যর্থ হয়। দুই দিন পর, ১৭ এপ্রিল দুপুরে, বাড়ির অদূরে এক নির্জন স্থানে বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হয় তার নিথর দেহ। একটি মোরগ ধরতে গিয়ে স্থানীয় এক যুবক বস্তাটি দেখতে পান। পোশাক দেখে পরিবার শনাক্ত করে প্রিয় শিশুটিকে।
ঘটনার পরপরই নিশাতের মা আকলিমা আক্তার সদর মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তারা উন্মোচন করে এই শিহরণ জাগানো হত্যার রহস্য।
তদন্তে উঠে আসে চমকে দেওয়া তথ্য—অভিযুক্ত ইসহাক মিয়া (২৯), যিনি ছিলেন ভুক্তভোগী পরিবারেরই প্রতিবেশী। প্রথমে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করে তিনি দাবি করেন, ঘটনার দিন তিনি এলাকায় ছিলেন না। কিন্তু প্রযুক্তির কাছে তার সেই গল্প টেকেনি। মোবাইল ফোনের লোকেশন বিশ্লেষণে প্রমাণিত হয়, পুরো সময়টাতেই তিনি ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান করছিলেন। সন্দেহ ঘনীভূত হয়, এবং ১৮ এপ্রিল দুপুরে তাকে নিজ বাড়ি থেকে আটক করে পিবিআই।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই ভেঙে পড়ে ইসহাক। তার স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে এক ভয়াবহ বাস্তবতা।
দুপুরে গ্রামের একটি স্কুলের সামনে নিশাতকে দেখে ফুসলিয়ে নিয়ে যায় সে। ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটিকে নিয়ে যায় রসুলপুর এলাকার একটি পার্কে। দিনভর ঘোরাঘুরির পর রাতের দিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়—সেই সময় তার স্ত্রী-সন্তান বাড়িতে ছিল না। রাতে শিশুটির সঙ্গে অনৈতিক আচরণের চেষ্টা করলে নিশাত প্রতিবাদ করে এবং মাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলে। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ইসহাক। নিজের অপরাধ ধামাচাপা দিতে গেঞ্জি দিয়ে মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে শিশুটিকে। পরে মরদেহ বস্তায় ভরে রেখে দেয়, এবং পরদিন নির্জন স্থানে ফেলে দেয়।
পিবিআই অভিযুক্তের দেখানো মতে হত্যায় ব্যবহৃত গেঞ্জি উদ্ধার করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সে একাই এই অপরাধ ঘটিয়েছে। তবে তদন্ত এখনও চলমান।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। শনিবার অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে নেওয়ার সময় উত্তেজিত জনতা তার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় তার অটোরিকশাও। এই প্রতিক্রিয়া যেমন মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, তেমনি এটি আইন-শৃঙ্খলার প্রতি আস্থাহীনতারও ইঙ্গিত দেয়।
১৮ এপ্রিল ময়নাতদন্ত শেষে নিশাতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং দাফন সম্পন্ন হয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনো বাতাসে ঝুলছে—এই মৃত্যু কি এড়ানো যেত না?
এই ঘটনাটি আমাদের সামনে কয়েকটি কঠিন সত্য দাঁড় করিয়ে দেয়।
প্রথমত, “পরিচিত মানুষ মানেই নিরাপদ”—এই ধারণা ভেঙে পড়ছে।
দ্বিতীয়ত, শিশুদের নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়।
তৃতীয়ত, বিকৃত মানসিকতার মানুষ আমাদের চারপাশেই আছে—আমরা শুধু তা দেখতে পাই না, বা দেখতে চাই না।
শিশুদের সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি, এবং দ্রুত বিচার—এই তিনটি স্তম্ভ এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি। নইলে নিশাতের মতো আরও অনেক নিষ্পাপ জীবন অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।
নিশাত আর ফিরবে না। কিন্তু তার গল্প আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়—আমরা কি সত্যিই একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি? নাকি আমরা কেবল ঘটনাগুলো ভুলে যাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে গেছি?
এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, আগামী দিনে আর কোনো নিশাতকে আমরা হারাব কি না।