বাবার স্বীকৃতি নেই, ছেলে সন্তানকে মানুষ করার স্বপ্ন রুপা’র

নিজস্ব প্রতিনিধি 

নিজের সন্তানের বাবার পরিচয় না থাকলেও মায়ের কোলেই ঠাঁই হলো নবজাতক ছেলে শিশুটির। অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য আর সংগ্রামে ঘেরা জীবনের মাঝেই শুরু হলো তার পৃথিবীর পথচলা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলস্টেশনের ১ নম্বর প্লাটফর্মের ওভারব্রিজের নিচেই এখন মা ও নবজাতকের নতুন আশ্রয়।

সোমবার (২৫ মে) বিকেল ৫টার দিকে মানবিক সংগঠন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর উদ্যোগে নবজাতক সন্তানকে বুকে জড়িয়ে সেখানে ফিরে যান অসহায় মা মাহমুদা আক্তার রুপা (২০)। যে জায়গায় একসময় ভবঘুরে ও ভাসমান জীবন কাটিয়েছেন তিনি, সেখানেই এখন শুরু হলো তার নবজাতক ছেলে শিশুর জীবনযুদ্ধ।

রুপা ও তার সন্তানকে আখাউড়া রেলস্টেশনে পৌঁছে দেওয়ার আগে বিষয়টি অবগত করা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী, সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম, আখাউড়া রেলওয়ে থানার (ওসি) এস এম শফিকুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহ আলমকে৷

বিদায়ের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের পক্ষ থেকে নবজাতকের জন্য ৫ সেট জামা-প্যান্ট, ৫ সেট গেঞ্জি-প্যান্ট, ৫ সেট সেন্টু গেঞ্জি, একটি বেডশিট, বালিশ, কুলবালিশ, একটি বড় প্যাকেট প্যাম্পাস, দুটি ওয়াশেবল প্যাম্পাস,
একটি বড় ভেজা টিস্যুর বক্স, দুটি তোয়ালে, একটি মশারি ও প্রয়োজনীয় শিশুসামগ্রী প্রদান করা হয়। এছাড়া রুপার জন্য দুই সেট নতুন কাপড় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তাও দেওয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার প্রায় ৭০ শতাংশ ওষুধ সরবরাহ করে এবং বাকি ওষুধের ব্যবস্থা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর।

জানা যায়, বিয়ের প্রলোভনে পড়ে সাব্বির নামের এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে অন্তঃসত্ত্বা হন রুপা। কিন্তু গর্ভধারণের পরই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। অভিযোগ রয়েছে, সন্তানকে নিজের বলে স্বীকার না করে রুপাকে ছেড়ে চলে যান ওই যুবক। সমাজের নির্মম বাস্তবতায় তখন একেবারেই একা হয়ে পড়েন এই তরুণী। গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাত থেকে প্রসববেদনায় কাতর রুপাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের গাইনি বিভাগে ভর্তি করা হয়। গভীর রাতজুড়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা রুপার পাশে দাঁড়ান হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। নিজেদের দায়িত্বের বাইরে গিয়েও তারা চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। পরিস্থিতির অবনতি হলে গত শুক্রবার (২২ মে) ভোররাত ৩টার দিকে জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে রুপা একটি সুস্থ ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। অপারেশন পরিচালনা করেন গাইনি কনসালটেন্ট ডা. কামরুন্নাহার বেগম এবং অ্যানেসথেসিয়ার দায়িত্বে ছিলেন ডা. হাবিবুর রহমান শামীম। হাসপাতালের নার্স ও অপারেশন থিয়েটারের স্টাফদের সহযোগিতায় নিরাপদে পৃথিবীর আলো দেখে নবজাতক শিশুটি। বর্তমানে মা ও সন্তান দু’জনই সুস্থ রয়েছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রুপার জন্ম কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় হলেও ছোটবেলা থেকেই তার বেড়ে ওঠা আখাউড়া রেলস্টেশন এলাকায়। সেখানেই পরিচয় হয় সাব্বিরের সঙ্গে। প্রেম, বিয়ের স্বপ্ন ও বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে একসময় তাকে একা ফেলে চলে যাওয়া হয়। তবে অনাগত সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছেন রুপা।

অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসার জন্য স্থানীয় কিছু মানুষ যে অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন, তার একটি অংশ আত্মসাৎ করে এক নারী রুপাকে হাসপাতালে রেখেই চলে যান। তবে এমন অমানবিকতার মধ্যেও মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ প্রশাসন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। তাদের আন্তরিক সহযোগিতায় সঠিক চিকিৎসা ও নিরাপদ সেবাযত্ন পেয়েছেন রুপা ও তার নবজাতক সন্তান।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আজহার উদ্দিন বলেন, “মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা রুপা ও তার নবজাতক সন্তানের পাশে দাঁড়িয়েছি। ভবিষ্যতেও তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”

হাসপাতালের গাইনি বিভাগের ইনচার্জ মোছা. মর্জিনা বেগম বলেন, “রুপার শারীরিক অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। চিকিৎসক ও নার্সদের আন্তরিক চেষ্টায় মা ও সন্তান দু’জনকেই সুস্থ রাখা সম্ভব হয়েছে।”

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী বলেন, “অসহায় এই মায়ের চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাসপাতালের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়েছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই আমরা দায়িত্ব পালন করেছি।”

আখাউড়া রেলওয়ে থানার (ওসি) এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, “মা ও নবজাতকের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার (ওসি) শহীদুল ইসলাম বলেন, “সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। রুপা হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই খোঁজ রেখেছি৷ প্রয়োজনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।”

তীব্র কষ্ট, অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মাঝেও নিজের সন্তানকে কারও হাতে তুলে দিতে রাজি নন রুপা। তিনি চান, সব প্রতিকূলতাকে জয় করে তার সন্তান একদিন মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠুক।

আজ নবজাতক শিশুটির পরিচয়ে বাবার নাম নেই, আছে শুধু মায়ের ভালোবাসা আর সংগ্রামের ইতিহাস। সমাজের অবহেলা, প্রতারণা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এক অসহায় মা প্রমাণ করে দিয়েছেন মাতৃত্ব কখনও পরাজিত হয় না। আর মানবিক মানুষগুলো এখনো আছেন বলেই পৃথিবীটা পুরোপুরি নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি।

Please follow and like us:
0
fb-share-icon20
Tweet 20
Pin Share20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *