সম্পাদকীয়,
আধুনিক নাগরিক সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ ও গ্যাস। তবে প্রতিদিনের অভ্যস্ত জীবনে কোনো কারণে এ দুটি জ্বালানি না থাকলে কিংবা চিরতরে ফুরিয়ে গেলে থমকে যেতে পারে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। চরম ভোগান্তি আর সাময়িক স্থবিরতার এই চিত্রের পেছনেই কিন্তু লুকিয়ে আছে মানবদেহে সুস্থতা ফিরিয়ে আনা এবং প্রকৃতির পুনর্জন্মের এক নতুন সম্ভাবনা। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম নির্ভরতা কমলে দীর্ঘমেয়াদে মানবজীবন ও সার্বিক পরিবেশের ক্ষেত্রে কিছু বৈপ্লবিক উপকারিতা দেখা যেতে পারে।
কৃত্রিম আলো এবং রাতের বেলা ডিজিটাল স্ক্রিনের (টিভি, স্মার্টফোন) অনুপস্থিতিতে মানবদেহের প্রাকৃতিক বায়োলজিক্যাল ক্লক বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ স্বস্থানে ফিরবে। সন্ধ্যার পর মানুষ জলদি ঘুমিয়ে পড়তে বাধ্য হওয়ায় গভীর ও পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত হবে।
রাত জেগে কৃত্রিম আলো বা মনিটরের দিকে তাকিয়ে না থাকার ফলে চোখের ক্লান্তি, শুষ্কতা ও দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা অনেকাংশে কমবে।
এসি, লিফট, রাইস কুকার, ওয়াশিং মেশিন বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের বিকল্প হিসেবে মানুষকে শারীরিক শ্রম দিতে হবে। এতে স্থূলতা (Obesity) ও আলস্য দূর হয়ে শরীরে ফিরে আসবে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা।
স্মার্টফোন, ইন্টারনেট বা ভার্চুয়াল জগতের বিনোদন বন্ধ থাকায় পরিবারের প্রতিটি সদস্য একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাবেন। ঘরের ভেতর মুখোমুখি কথা বলা এবং গল্পগুজবের মাধ্যমে পারিবারিক মেলবন্ধন সুদৃঢ় হবে।
রাতের বেলায় আলো ও একক ঘরের বিনোদন না থাকায় প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কুশল বিনিময়ের প্রবণতা বাড়বে, যা আধুনিক শহরের প্রায় হারিয়ে যাওয়া ‘কমিউনিটি স্পিরিট’ বা সামাজিক ঐক্য ফিরিয়ে আনবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন (কয়লা ও জেনারেটর নির্ভর) এবং গ্যাস পোড়ানো বন্ধ হলে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ নাটকীয়ভাবে কমে যাবে।
কলকারখানা ও এসি বন্ধ থাকায় শব্দ ও আলোক দূষণ কমে আসবে। রাতে কৃত্রিম আলো না থাকায় রাতের আকাশ আবার আগের মতো স্পষ্ট ও তারা দিয়ে ঝলমল করে উঠবে, যা বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনচক্রের জন্য অত্যন্ত দরকারি।
জীবাশ্ম জ্বালানির সার্বিক ব্যবহার শূন্যে নেমে এলে বিশ্ব উষ্ণায়ন বা ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে।
ঐতিহ্যবাহী জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে বাধ্য হয়েই মানুষ সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুগ্যাস ও বায়ুপ্রবাহের মতো প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব শক্তির ব্যবহারে শতভাগ উদ্বুদ্ধ হবে।
যেকোনো সম্পদের সীমাবদ্ধতা মানুষকে তা পরিমিত ও সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে শেখায়। এর ফলে প্রকৃতির অনন্য উপহারের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা বহু গুণ বেড়ে যাবে।
আধুনিক যুগের প্রযুক্তিনির্ভরতায় সাময়িক ছেদ পড়া কঠিন হলেও, প্রকৃতির নিজ ছন্দে ফিরে যাওয়া এবং মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার স্বার্থে এসব পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।