ফেসবুক পোস্টে মিলল পরিচয়, ৪ দিন পর প্রতিবন্ধী হাবিবের মরদেহ বুঝে পেল পরিবার।

নিজস্ব প্রতিনিধি 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে নিখোঁজের চার দিন পর পরিত্যক্ত একটি ডোবা থেকে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত যুবকের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তার নাম হাবিবুর রহমান (১৮)। তিনি জন্মগতভাবে শারীরিক, মানসিক ও বাক্‌প্রতিবন্ধী ছিলেন। পরিচয় শনাক্তের পর ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে শনিবার বিকেলে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেল ৫টার দিকে নাসিরনগর থানার নির্দেশনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর-এর মাধ্যমে হাবিবুর রহমানের চাচা আব্দুল জলিলের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। এ সময় নিহতের চাচা মো. ফজলু মিয়া, জান্টু মিয়াসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

নিহত হাবিবুর রহমান নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নের চৈয়ারকুড়ি গ্রামের মধ্যপাড়া এলাকার মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গোকর্ণ ইউনিয়নের জেঠাগ্রাম চটিপাড়া এলাকার একটি পরিত্যক্ত ডোবায় যুবকের মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে নাসিরনগর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকায় মরদেহটি পচে যায় এবং হাতের আঙুলের চামড়া উঠে যাওয়ায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। পরিচয় শনাক্তের জন্য বিষয়টি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ইউনিটকে জানানো হয়। পরে পিবিআইয়ের একটি দল হাসপাতালে গিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। ফলে তখন পর্যন্ত মরদেহটির কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহটি হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হয়। একই সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের ফেসবুক পেজে অজ্ঞাত যুবকের মরদেহের ছবি ও পরিচয় শনাক্তের জন্য পোস্ট দেওয়া হয়। ওই পোস্ট দেখেই হাবিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা তার পরনে থাকা কালো-সাদা ডোরাকাটা শার্ট দেখে মরদেহটি হাবিবের বলে শনাক্ত করেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, হাবিবুর রহমান ও শাহানা বেগম দুই ভাই-বোন। প্রায় ১৫ বছর আগে তাদের বাবা মারা যান। পরে তাদের মা অন্যত্র বিয়ে করেন। জন্মগতভাবেই হাবিবুর রহমান শারীরিক, মানসিক ও বাক্‌প্রতিবন্ধী ছিলেন। তিনি সাঁতার কাটতে পারতেন না। বেশির ভাগ সময় রাতের বেলায় চৈয়ারকুড়ি বাজার এলাকায় থাকতেন এবং বিভিন্ন মানুষের কাছে চেয়ে খাবার খেতেন। মাঝে মাঝে বাড়িতে আসতেন এবং চাচি মোছা. ছায়েরা বেগমের কাছেও যেতেন।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট সকাল ৮টার দিকে হাবিব তার চাচির বাড়িতে যান। সেখানে চাচি তাকে গোসল করিয়ে ভাত খাওয়ান এবং কালো-সাদা ডোরাকাটা হাফহাতা শার্ট পরিয়ে দেন। সকাল ৯টার দিকে তিনি চাচির বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

পরিবারের ধারণা, ওইদিন দিবাগত রাতে জেঠাগ্রামের দক্ষিণ চটিপাড়া এলাকার সাহেব বাড়িতে অনুষ্ঠিত মিলাদ ও মাহফিলে হাবিব গিয়েছিলেন। মিলাদ শেষে বাড়ি কিংবা চৈয়ারকুড়ি বাজারে যাওয়ার পথে রাতের অন্ধকারে তিনি ডোবার পানিতে পড়ে গিয়ে মারা যেতে পারেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ২৭ আগস্ট বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অজ্ঞাতনামা মরদেহের ছবি দেখতে পান তারা। ছবিতে হাবিবের পরনে থাকা কালো-সাদা ডোরাকাটা শার্ট দেখে তাদের সন্দেহ হয়। পরে নাসিরনগর থানা পুলিশ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের সঙ্গে যোগাযোগ করে মরদেহটি হাবিবুর রহমানের বলে নিশ্চিত হন তারা। সকল আইনি প্রক্রিয়া শেষে শনিবার বিকেলে পরিবারের সদস্যদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। পরে শনিবার রাতে পারিবারিক কবরস্থানে হাবিবুর রহমানের দাফন সম্পন্ন হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিঃ মোঃ আজহার উদ্দিন বলেন, অজ্ঞাতনামা মরদেহটির পরিচয় শনাক্তে আমরা ফেসবুক পেজে পোস্ট দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরে পরিবারের সদস্যরা পোস্টটি দেখে মরদেহটি তাদের নিখোঁজ স্বজন হাবিবুর রহমানের বলে শনাক্ত করেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে নাসিরনগর থানার নির্দেশনায় পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর সহযোগিতা করেছে। একজন মানুষের শেষ বিদায়ে পরিবারের পাশে থাকতে পেরে আমরা মানবিক দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি।

নিহত হাবিবুর রহমানের চাচা আব্দুল জলিল বলেন, হাবিব জন্ম থেকেই শারীরিক, মানসিক ও বাক্‌প্রতিবন্ধী ছিল। সে সাঁতার জানত না। গত ২৫ আগস্ট চাচির বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর বাড়িতে ফেরেনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ফেসবুকে অজ্ঞাত লাশের ছবি দেখে তার পরনের শার্ট দেখে আমরা হাবিবকে চিনতে পারি। চার দিন পর হলেও তাকে শনাক্ত করে শেষবারের মতো পরিবারের কাছে ফিরে পেয়েছি। এজন্য পুলিশ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।

নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহিনুল ইসলাম বলেন, পরিত্যক্ত ডোবা থেকে অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধারের পর পরিচয় শনাক্তের জন্য পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পানিতে দীর্ঘ সময় থাকায় হাতের আঙুলের চামড়া উঠে যাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্টের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি শনাক্ত করেন। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

Please follow and like us:
0
fb-share-icon20
Tweet 20
Pin Share20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *