স্টাফ রিপোর্টার,
নিখোঁজ হওয়ার ছয় দিন পর অবশেষে পরিবারের সন্ধান পেয়েছেন হাশিম উদ্দিন (৪৮)। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তবে পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন তিনি। পরে আবারও তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেল ৩টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে ফাঁড়ির নির্দেশনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের মাধ্যমে হাশিম উদ্দিনকে তাঁর স্ত্রী পারভীন আক্তারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
হাশিম উদ্দিন ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের উচাখিলা গ্রামের মৃত/প্রয়াত আব্দুল মোতালেব ও সাফিয়া খাতুনের ছেলে। তাঁর জন্ম ১৯৭৮ সালের ১৫ মে। তাঁর স্ত্রী পারভীন আক্তার এবং ১১ বছর বয়সী এক ছেলে সন্তান রয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫ বছর আগে পারভীন আক্তারের সঙ্গে হাশিম উদ্দিনের বিয়ে হয়। কয়েক বছর আগে হাশিম উদ্দিনের ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচার হয়। এরপর তাঁর শরীরের ডান হাত-পা ও বাম পাশের বিভিন্ন অংশে পক্ষাঘাতজনিত সমস্যা দেখা দেয়। শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি ভিক্ষাবৃত্তি করতেন।
গত ২৪ আগস্ট হাশিম উদ্দিনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। এর আগে তিনি ট্রেনে করে ভৈরব থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে অসুস্থ হয়ে পড়লে স্টেশন মাস্টার ও রেলওয়ে পুলিশ ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের পশ্চিম পাশ থেকে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। ভর্তি টিকিটে তাঁর নাম ‘হাশেম উদ্দিন’ এবং পিতার নাম ‘আঃ মোতালেব’ লেখা হয়েছিল। তখন তিনি অচেতন অবস্থায় থাকায় তাঁর ঠিকানা কিংবা পরিবারের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এরপর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা ও দেখাশোনা চলছিল। পরবর্তীতে গত ২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ইনস্পেক্টর বেলাল উদ্দিন হাশিম উদ্দিনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করেন। জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেইজের সঙ্গে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলিয়ে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে বিষয়টি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) জানানো হয়।
এদিকে পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পরও হাশিম উদ্দিনকে নিয়ে ঘটে আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে তিনি হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যান। পরে শনিবার (২৯ আগস্ট) রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কোর্টরোড এলাকায় ভিক্ষারত অবস্থায় তাঁকে দেখতে পান সংশ্লিষ্টরা। পরে তাঁকে উদ্ধার করে আবারও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাশিম উদ্দিনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর শনিবার রাতে সেটি দেখতে পান তাঁর স্ত্রী পারভীন আক্তার। পরে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যাচাই-বাছাইয়ের পর নিশ্চিত হওয়া যায়, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই ব্যক্তিই তাঁর স্বামী হাশিম উদ্দিন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিঃ মোঃ আজহার উদ্দিন বলেন, “হাশিম উদ্দিনকে যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন তিনি অসুস্থ ও অচেতন ছিলেন। তাঁর পরিচয় বা পরিবারের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা তাঁর চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় দেখাশোনার ব্যবস্থা করি। পরে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশের পর তাঁর স্ত্রী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরিবারের কাছে তাঁকে নিরাপদে তুলে দিতে পেরে আমরা আনন্দিত।”
হাশিম উদ্দিনের স্ত্রী পারভীন আক্তার বলেন, “আমার স্বামী কয়েক দিন আগে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর অনেক খোঁজ করেও তাঁর সন্ধান পাচ্ছিলাম না। ফেসবুকে তাঁর ছবি দেখে বুঝতে পারি, তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাসপাতালে আছেন। পরে বাতিঘরের সঙ্গে যোগাযোগ করি। স্বামীকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেয়ে আমি খুবই খুশি ও স্বস্তি পেয়েছি। যারা তাঁকে উদ্ধার, চিকিৎসা ও পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে সহযোগিতা করেছেন, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই শাহ আলম মিয়া বলেন, “হাশিম উদ্দিনকে রেলওয়ে স্টেশন থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তখন তাঁর পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে পিবিআইয়ের মাধ্যমে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলিয়ে তাঁর পরিচয় শনাক্ত হয়। পরিবারের সদস্যরা আসার পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে তাঁর স্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”
ছয় দিন নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে স্ত্রী ও পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন হাশিম উদ্দিন। বর্তমানে তিনি সুস্থ রয়েছেন এবং স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বলতে পারছেন।