জহির শাহ্, বার্তা সম্পাদক
চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলায় এখনও প্রায় অর্ধলাখ শিশু কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি, যা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যালয়ের কম সংখ্যা, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং দূরবর্তী ভৌগোলিক পরিস্থিতি শিশুদের শিক্ষার অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জরিপে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী ৪৬,৪৬৪ শিশুই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে হাওরবেষ্টিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা, যেখানে প্রায় ১৬,৩৫৩ শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে। নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলা যথাক্রমে ৬,৭৫৯ ও ৫,৭৫০ শিশু নিয়ে পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, করোনোত্তর অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পরিবারের আয় হ্রাস শিশুদের বিদ্যালয় বিমুখ করার মূল কারণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুর রহমান বণিক জানান, হাওরের কারণে বছরের অনেক সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে, ফলে ২২টি হাওরাঞ্চল বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতি কম এবং ভর্তি বাধাপ্রাপ্ত। তিনি বলেন, “বিকল্প শিক্ষা উদ্যোগ যেমন মোবাইল স্কুল বা স্যাটেলাইট ক্লাসরুম ছাড়া শতভাগ ভর্তি সম্ভব নয়।”
অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আতাউর রহমান জানিয়েছেন, পিছিয়ে পড়া এলাকার শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে স্যাটেলাইট স্কুল, অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র ও দূরশিক্ষণ কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য, প্রতিটি শিশু অন্তত দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত নিয়মিতভাবে বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ করুক। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধির সক্রিয় ভূমিকা অত্যাবশ্যক।”
নগর এলাকায়ও শিশুশ্রমের কারণে শিক্ষাবঞ্চনা দৃশ্যমান। কর্ণফুলী নদীপাড়ের শুকনো মাছ পল্লীতে কাজ করা ১২ বছরের মোকলেস এবং কালুরঘাটের ১০ বছরের সুমন মিয়া তাদের পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। বর্তমান চট্টগ্রাম বিভাগের ১১০টি উপজেলায় বিদ্যালয়গম্য শিশু ৪০,৫৪,২৫২ জনের মধ্যে ৩৮,৮৯,৯৭৮ শিশু ভর্তি হলেও ৫৯,৯২৮ শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর সংখ্যা চট্টগ্রাম জেলায় সর্বোচ্চ ৩,২৯৮, রাঙ্গামাটিতে সর্বনিম্ন ১৫২।
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে না, বরং স্থানীয় সমাজের সচেতনতা এবং উদ্যোক্তাদের সহযোগিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, “শিক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রম নয়, এটি ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। পরিবারকে বোঝাতে হবে বিদ্যালয় শিশুদের বোঝা নয়, বরং তাদের সম্ভাবনার দ্বার।”
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী বছর হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলে “ভাসমান বিদ্যালয় কার্যক্রম” চালু হবে, যাতে বর্ষা মৌসুমেও শিশুরা নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ পায়। সংক্ষেপে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অর্ধলাখ শিশু এখনো শিক্ষার বাইরে, যা জাতির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি সতর্কবার্তা; যখন শিক্ষা থেমে যায়, থেমে যায় উন্নয়ন, থেমে যায় স্বপ্ন।