সম্পাদকীয়,
আমাদের নদীমাতৃক বাংলাদেশে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ ঐতিহ্যটি কেবল একটি প্রবাদ নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব ও সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, প্রতিনিয়ত অসচেতনতা এবং লোভের বলি হয়ে ধ্বংস হচ্ছে আমাদের মৎস্যসম্পদ। বিশেষ করে, প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ও পোণামাছ নির্বিচারে নিধন আমাদের মৎস্য খাতের ভবিষ্যৎকে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পোনামাছ রক্ষা করা এখন আর কেবল পরিবেশবাদীদের স্লোগান নয়, এটি আমাদের অর্থনৈতিক ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য এক জরুরি লড়াই।
আজকের যে পোণামাছ, আগামী দিনে সেটাই পূর্ণাঙ্গ মাছে পরিণত হবে। কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারী বা মশারি জালের মতো ক্ষতিকর ফাঁদ ব্যবহার করে রেণু ও পোণামাছ ধ্বংস করার অর্থ হলো—ভবিষ্যতের মৎস্যকূলকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা।
জলাশয়ের প্রতিটি মাছের নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। পোণামাছ নির্বিচারে তুলে ফেললে জলজ বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) ভেঙে পড়ে, যা সামগ্রিক পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।
মৎস্য খাতের ওপর এদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। পোণামাছ ধ্বংস হলে নদী-নালা ও উন্মুক্ত জলাশয় মাছশূন্য হয়ে পড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে জেলে সম্প্রদায় ও দেশের অর্থনীতিতে।
আইনের কঠোর প্রয়োগ: নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। প্রজনন মৌসুমে ও পোণামাছ ধরার নির্দিষ্ট সময়ে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা আবশ্যক।
সামাজিক সচেতনতা: শুধু আইন দিয়ে সব বন্ধ করা সম্ভব নয়। জেলেপাড়া থেকে শুরু করে সাধারণ ক্রেতা—সবাইকে সচেতন হতে হবে। “পোণামাছ ধরব না, কিনব না” —এই মানসিকতা সবার মধ্যে তৈরি করতে হবে।
বিকল্প কর্মসংস্থান: জাটকা বা পোণামাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের জন্য যে সরকারি সহায়তার (ভিজিএফ চাল) ব্যবস্থা রয়েছে, তার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে যেন অভাবের তাড়নায় কেউ নদীতে না নামে।
শেষ কথা:
নদী ও জলাশয়গুলো প্রকৃতির এক অনন্য আশীর্বাদ। সাময়িক লাভের আশায় ক্ষতিকর জাল ফেলে পোণামাছ ও ডিমওয়ালা মা মাছ ধ্বংস করা এক ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আসুন, নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হই। বাজার থেকে ছোট পোণামাছ কেনা বর্জন করি এবং নদী-জলাশয়ের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে ভূমিকা রাখি।
আজকের বাঁচানো পোণামাছই আগামী দিনের রূপালী সম্পদের বিপ্লব ঘটাবে।
মোঃ ইসমাইল, সম্পাদক ব্রাহ্মণবাড়িয়া সমাচার