বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: ইতিহাসের উত্তরাধিকার, গণতন্ত্র ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা।

অনলাইন ডেস্ক:

আগামী ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির ইতিহাস, রাজনৈতিক দর্শন, নেতৃত্বের উত্তরাধিকার এবং বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দলটির কাছে জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সমর্থকরাও দিনটিকে অতীতের সংগ্রাম ও ত্যাগ স্মরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের নতুন অঙ্গীকারের দিন হিসেবে দেখছেন।

সংকটের সময়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠা:-
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিল অত্যন্ত কঠিন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনায় নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়। দলটির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে উঠে আসে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ধারণা।

বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থীসহ সাধারণ জনগণকে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অংশীদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার:-
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা, পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশের ইতিহাসে নানা মূল্যায়ন রয়েছে।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি, উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং জনগণের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তিনি বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশে ভূমিকা রাখেন বলে বিএনপি মনে করে।

তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই রাজনৈতিক দর্শনকে নতুন বাস্তবতার আলোকে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে এটি বিএনপির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে রয়েছে।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম:-
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি নেতৃত্ব ও সাংগঠনিকভাবে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন, নির্বাচনী রাজনীতি এবং সংসদীয় ব্যবস্থায় বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখেন।

তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। একই সঙ্গে দলটি বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।

নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব:-
বর্তমান সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটির সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দর্শনকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।

বর্তমান প্রজন্মের প্রত্যাশা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন। তরুণরা কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, ন্যায়বিচার, নিরাপদ জীবন এবং কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশা করে।

ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে শুধু অতীতের গৌরবের কথা বলাই যথেষ্ট নয়; ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মপরিকল্পনাও জনগণের সামনে তুলে ধরা জরুরি।

গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের সঙ্গে জবাবদিহির দায়িত্ব:-
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দলের প্রতি অন্যতম বড় প্রত্যাশা হচ্ছে জনগণের আস্থা ও রাজনৈতিক ম্যান্ডেটকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা।

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য শুধু ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নয়—এটি জনগণের প্রতি জবাবদিহিরও বিষয়। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা এবং দলীয় নেতাকর্মী—সবার কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, দক্ষতা, সততা ও জনকল্যাণের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মতের ভিন্নতাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখলেও গণতান্ত্রিক সহনশীলতা ও সাংবিধানিক মূল্যবোধ বজায় রাখার প্রত্যাশা থাকে।

অর্থনীতি ও সুশাসন হবে বড় পরীক্ষা:-
বর্তমান বাংলাদেশের সামনে অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

এসব সমস্যা সমাধানে জনগণ তাৎক্ষণিক কোনো অলৌকিক পরিবর্তনের চেয়ে কার্যকর পরিকল্পনা, দৃশ্যমান সংস্কার এবং ধারাবাহিক অগ্রগতি দেখতে চায়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার প্রত্যাশা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নতুন অঙ্গীকারের আহ্বান:-
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠার স্মরণ নয়; দলটির ইতিহাস, রাজনৈতিক দর্শন ও ভবিষ্যৎ দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবারও উপলক্ষ।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শন, বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশাকে সমন্বয় করে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তা গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজনীতিতে ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার, প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহনশীলতা, ক্ষমতার প্রদর্শনের পরিবর্তে জনগণের সেবা এবং রাজনৈতিক বিভাজনের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির সামনে তাই অঙ্গীকার হওয়া উচিত গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা, জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা, অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং একটি মানবিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করা।

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রত্যাশা-অতীতের ত্যাগ ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা ও আস্থার প্রতি সম্মান রেখে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও জনমুখী ও গণতান্ত্রিক করার আহ্বানও রয়েছে।

 মোঃ হাসান আলী রেজা দোজা
চেয়ারম্যান, বোর্ড অব ট্রাস্টি,
গ্লোবাল কনজ্যুমার এন্ড হিউম্যান রাইটস ফোরাম (গভ: রেজি:নং-৮৩৯৫/২৫)
সিনিয়র সহ-সভাপতি, অনলাইন জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ওজাব)
জাতীয়তাবাদী অনলাইন এক্টিভিষ্ট

Please follow and like us:
0
fb-share-icon20
Tweet 20
Pin Share20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *