সম্পাদকীয়,
সংবাদমাধ্যমের প্রধান কাজ সমাজ ও রাষ্ট্রের অসংগতি তুলে ধরা, অন্যায়-অনিয়মের মুখোশ উন্মোচন করা এবং গণমানুষের কণ্ঠস্বরকে প্রতিফলিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল একযোগে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বা প্রবণতা একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে—অনলাইন সংবাদের ক্ষেত্রে মূল মানদণ্ড কি ‘নিবন্ধন’ নাকি ‘সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা’?
নিবন্ধন থাকলেই যে একটি মাধ্যম শতভাগ বস্তুনিষ্ঠ ও স্বাধীন সাংবাদিকতা করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধিত গণমাধ্যমকে নানা আইনি ও প্রশাসনিক বেড়াজালে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তি, আমলা কিংবা জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতির খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বড় মাধ্যমগুলো অনেক সময় নানা চাপের মুখে পড়ে। অন্যদিকে, দেশের আনাচে-কানাচে ঘটে যাওয়া বহু প্রান্তিক ঘটনা বড় বা নিবন্ধিত মাধ্যমের নজর এড়িয়ে যায়, কিংবা বাণিজ্যিক বা কৌশলগত কারণে তারা তা প্রচার করা থেকে বিরত থাকে। এসব ক্ষেত্রে বিকল্প অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ছোট পোর্টালগুলোই স্থানীয় অন্যায়-অবিচারের খবর দ্রুত জনগণের সামনে নিয়ে আসে।
অনিবন্ধিত হলেই কোনো মাধ্যমকে ‘অবৈধ’ বা ‘ক্ষতিকর’ বলে ঢালাওভাবে বন্ধ করে দিলে মূলধারার বাইরে থাকা এসব বস্তুনিষ্ঠ খবর চাপা পড়ে যাওয়ার বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সেন্সরশিপের মাধ্যমে কখনো সত্যের প্রবাহ রোধ করা সম্ভব নয়; বরং এতে জনমনে সংশয় ও অসন্তোষ বাড়ে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, অনিয়ন্ত্রিত ভূঁইফোড় পোর্টাল বা গুজবের সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিতে হবে। হলুদ সাংবাদিকতা, ব্ল্যাকমেইলিং এবং গুজব ছড়ানো যেকোনো সুস্থ সমাজের জন্য হুমকি। কিন্তু প্রতিকারের উপায় ঢালাও বন্ধকরণ নয়। ব্যবস্থার মূল ফোকাস হওয়া উচিত—সংবাদটি ‘বস্তুনিষ্ঠ’ কি না।
নিবন্ধিত হোক বা অনিবন্ধিত, যে মাধ্যমই ভুল তথ্য, গুজব বা উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করবে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
তথ্য প্রকাশের পথ রুদ্ধ না করে নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে জটিলতামুক্ত ও উন্মুক্ত করতে হবে, যাতে তরুণ ও স্বাধীন সাংবাদিকেরা সহজে আইনি কাঠামোর মধ্যে আসতে পারেন।
সরকার বা প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপের বদলে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন বা প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে পোর্টালগুলোর মাননিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতেই পোর্টাল বন্ধের পাইকারি নীতি থেকে সরে আসতে হবে। কোনো পোর্টাল নিবন্ধিত কি না, তার চেয়ে বড় কথা সেটি সত্য প্রকাশ করছে কি না। অপরাধ বা গুজবের বিস্তার রোধে নিবন্ধনের দোহাই না দিয়ে সংবাদের গুণগত মান ও বস্তুনিষ্ঠতার ভিত্তিতে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই সময়ের দাবি।