নিখোঁজের ২৬ দিন পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মিলল সাঈদের সন্ধান, পরিবারের কাছে হস্তান্তর।

স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া:

নিখোঁজের ২৬ দিন পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে তিন দিন চিকিৎসাধীন থাকা মানসিক রোগী মো. শাহিদুর রহমান (সাঈদ)-এর পরিবারের সন্ধান মিলেছে। পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের উদ্যোগে সাঈদকে তাঁর বড় চাচা আমজাদ মিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় তাঁর ফুফাতো ভাই মো. শান্ত উপস্থিত ছিলেন। পরে তাঁকে ট্রেনে করে ময়মনসিংহ পাঠানো হয়। চিকিৎসা শেষে তার প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়।

সাঈদ (২২), রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের বোচাদহ গ্রামের মো. মনিরুল ইসলাম ও সালমা বেগমের ছেলে। তিনি মানসিক রোগে আক্রান্ত। তাঁর বাবা মনিরুল ইসলামও মানসিক প্রতিবন্ধী। দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের চিকিৎসা চলছিল।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ত্রিশাল ইউনিয়নের সতেরপাড়া এলাকায় প্রাণ কোম্পানির অধীন একটি ভবনের পাইলিংয়ের কাজ করতেন সাঈদ। গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে ত্রিশালে তাঁর মামা আক্তারুলের বাসা থেকে বের হয়ে তিনি নিখোঁজ হন। এর আগে গত ২৫ আগস্ট তিনি ময়মনসিংহের ত্রিশালে মামার বাড়িতে গিয়েছিলেন। নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা তাঁর সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে থাকেন। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের ফেসবুকে প্রকাশিত ছবি দেখে পরিবারের সদস্যরা সাঈদকে শনাক্ত করেন। এরপর তাঁর নিকটাত্মীয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মো. লিটন মিয়া বাতিঘরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে পরিবারের সদস্যরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। মঙ্গলবার বিকেলে সাঈদকে তাঁর বড় চাচা আমজাদ মিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সার্জারি বিভাগের নার্সিং ইনচার্জ পূজা রায় বলেন, “সাঈদ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর পরিচয় জানা যাচ্ছিল না। মানসিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় তাঁর কাছ থেকে সঠিক তথ্য পাওয়াও কঠিন ছিল। হাসপাতালের নার্স ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের সহযোগিতায় তাঁর চিকিৎসা ও দেখভাল করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিবারের সন্ধান পাওয়া গেছে।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিঃ মোঃ আজহার উদ্দিন বলেন, “অজ্ঞাত ও অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের মানবিক দায়িত্ব। সাঈদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে নিরাপদে স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, দীর্ঘদিন পর একজন মানুষ তাঁর পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন, এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দ।”

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী বলেন, “অজ্ঞাতপরিচয় রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাঈদের ক্ষেত্রেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, নার্সিং টিম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের সহযোগিতায় তাঁর চিকিৎসা ও পরিচয় শনাক্তের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিবারের কাছে তাঁকে ফিরিয়ে দিতে পারা একটি মানবিক সাফল্য।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলম বলেন, “হাসপাতালে ভর্তি ওই যুবকের পরিচয় প্রথমে শনাক্ত করা যায়নি। পরবর্তীতে বাতিঘরের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি আমরা অবগত আছি।”

উল্লেখ্য, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে অজ্ঞাত এক আহত যুবককে রেখে যায় কে বা কারা। পরে হাসপাতালের নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর-এর সহযোগিতায় তাঁকে সার্জারি বিভাগে ভর্তি করেন। তাঁর আনুমানিক বয়স ২২ বছর বলে ধারণা করা হয়।

ভর্তির সময় তাঁর টিকিটে ‘সাইফ’ নাম লেখা হলেও ওই যুবক মুখে নিজের নাম ‘সাঈদ’ বলছিলেন। তবে তিনি কোনো মোবাইল নম্বর বা ঠিকানা বলতে পারছিলেন না। শুধু এতটুকু জানাতে পারছিলেন যে, তিনি তাঁর মামা আক্তারুলের সঙ্গে ময়মনসিংহে পাইলিংয়ের কাজ করেন এবং মামার সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসেছেন। কীভাবে তিনি আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি। ভর্তি টিকিটে পিতা-মাতার নামের স্থানে ‘কেউ নাই’ এবং বয়স ২০ বছর উল্লেখ করা হয়েছিল। অসুস্থ ও অসচেতন অবস্থায় থাকায় তাঁর পরিচয়, ঠিকানা কিংবা পরিবারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁর মাথায় আঘাতের চিহ্ন এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ছিল। অজ্ঞাত ওই যুবকের চিকিৎসা ও দেখভালে হাসপাতালের নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর-এর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছিল। পরবর্তীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের ফেসবুক পেজে তাঁর ছবি প্রকাশ করা হলে পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করেন। যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হয়। তাঁর পরিচয় শনাক্ত ও স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর-এর উদ্যোগে হয়েছে৷

Please follow and like us:
0
fb-share-icon20
Tweet 20
Pin Share20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *