লুসাকা সম্মেলনের ধ্বনি: বিশ্ব রাজনীতিতে ডিজিটাল বিবর্তনের বজ্রগর্জন শুরু।

জহির শাহ্, বিশেষ প্রতিবেদন , ২৭ জুলাই ২০২৫

 

আধুনিক রাজনীতির রক্তাল্প হৃদস্পন্দনে যখন গণতন্ত্রের নিঃশ্বাস ক্ষীণ, তখন জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকায় ৯–১১ জুলাই অনুষ্ঠিত Africa Digital Parliamentary Summit 2025 হয়ে উঠল এক মহাসংঘাত—যেখানে রাজনীতি আর প্রযুক্তি একে অপরের চোখে তাকিয়ে বলল, “চলো, আমরা একসাথে ইতিহাস লিখি।” পুরো মহাদেশের ৫৪টি দেশ থেকে আগত আইনপ্রণেতা, প্রযুক্তিবিদ, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের অগ্রগণ্যরা মিলে এমন এক ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরি করলেন, যা শুধু আফ্রিকা নয়—সারা পৃথিবীর জন্য এক ডিজিটাল ম্যানিফেস্টো। আর সেই ঘোষণার নাম “The Lusaka Declaration”—যা ঘোষণা করে, পরবর্তী দশকে ব্লকচেইন হবে নির্বাচনের ভিত্তি, AI হবে জনসেবার সহায়ক, এবং ডেটার মালিক হবে জনগণ, কর্পোরেট সাম্রাজ্যের নয়।

এই সম্মেলনে আলোচনায় উঠে আসে এমন সব প্রশ্ন, যেগুলো আমাদের সময়কে কাঁপিয়ে তুলেছে: যদি ডেটা নতুন তেল হয়, তবে তার মালিক কে? যদি AI জনগণের মতামত বিশ্লেষণ করে, তবে তা কি গণতন্ত্রকে সহায়তা করবে, না নিয়ন্ত্রণ করবে? সাইবার নিরাপত্তা না থাকলে, কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে? আর কেন আজও বিশ্বের বেশিরভাগ সংসদে প্রযুক্তি বুঝে এমন একজন সদস্য নেই, যিনি আইন করতে পারেন মানুষের ও যন্ত্রের যৌথ স্বার্থে? সম্মেলনে বাস্তব অভিজ্ঞতার ঝলকও ছিল—নাইজেরিয়ায় ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সফলতা, কেনিয়ায় ব্লকচেইনভিত্তিক স্বাস্থ্য বীমা, ঘানায় স্মার্ট রেজিস্ট্রারদের মাধ্যমে জমির ডিজিটাল মালিকানা, এবং জাম্বিয়ায় পাহাড়ি গ্রামে AI চিকিৎসক। অথচ এই আলোচনার মধ্যেই যে তীব্র সতর্কবার্তাও ছিল, তা যেন উপেক্ষা করার নয়—যদি এখনই নৈতিক দিকনির্দেশনা না দেওয়া হয়, তবে AI হতে পারে নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র, ব্লকচেইন হতে পারে নজরদারির চাবুক, আর ডেটা হতে পারে নতুন প্রজন্মের দাসত্ব। আর এখানেই এই সামিটের অমূল্য শিক্ষা: প্রযুক্তি নিরপেক্ষ নয়, এর ব্যবহার নির্ধারণ করে এর নৈতিকতা। সম্মেলন শেষে প্যান-আফ্রিকান পার্লামেন্টের আহ্বানে গৃহীত হয় সিদ্ধান্ত—২০২৫ থেকে প্রতিটি দেশে চালু হবে AI নীতি, সাইবার নিরাপত্তা আইন, এবং ব্লকচেইনভিত্তিক গণতান্ত্রিক অবকাঠামো। এদিকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই সামিট যেন মহাজাগতিক আভাস—প্রযুক্তি শুধু উন্নয়নের বিষয় নয়, এটি এখন রাজনীতির কেন্দ্রে। আমরা চাইলে ঢাকার জাতীয় সংসদে “ডিজিটাল গণতন্ত্র আইন ২০২৫” প্রণয়ন হতে পারে, যেখানে নির্বাচনী ব্যালট, নাগরিক সেবা, দুর্নীতি বিশ্লেষণ—সবই পরিচালিত হবে প্রযুক্তি ও মানবিক নীতির সমন্বয়ে। আমরা চাইলে AI ব্যবহার করে ভুয়া খবর শনাক্ত করতে পারি, গুজব দমন করতে পারি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে গ্রামীণ পরিসরে নিয়ে যেতে পারি; আর চাইলে পার্লামেন্টে এমন আইনপ্রণেতা গড়তে পারি যারা কোডিং বোঝেন, নৈতিকতা বোঝেন, এবং নাগরিকের আস্থা রক্ষা করতে জানেন। আজকের তরুণ, যার হাতে মোবাইল আছে, সে-ই আগামীকালের টেকনো-নাগরিক; যিনি একদিকে প্রযুক্তিতে দক্ষ, অন্যদিকে গণতন্ত্রে সচেতন। তাই এই সম্মেলন আমাদের বলে—“যে দেশ এখনই প্রযুক্তির মানবিক ব্যবহার শুরু করবে, সে-ই হবে আগামী বিশ্বের নেতৃত্বদাতা।” আর বাংলাদেশ কি প্রস্তুত? প্রস্তুত কি আমাদের মন্ত্রীসভা, আমাদের নির্বাচন কমিশন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, আমাদের ইউনিয়ন পরিষদ? যদি প্রস্তুত না হই, তবে ইতিহাসের এই প্রযুক্তিগত ট্রেন আবারও আমাদের স্টেশন ছাড়িয়ে যাবে—আর আমরা দাঁড়িয়ে থাকব সেই পুরোনো প্ল্যাটফর্মে, ‘ভবিষ্যত’ নামের টিকিট হাতে। সুতরাং, সময় এসেছে জেগে ওঠার—লুসাকার আলো শুধু দেখতে নয়, তা হৃদয়ে ধারণ করে এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার।

Please follow and like us:
0
fb-share-icon20
Tweet 20
Pin Share20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *