বিজয়নগরে অটোরিকশাচালক দেলোয়ারকে পিটিয়ে হত্যা

জহির শাহ্ , বার্তা সম্পাদক , ১৫ নভেম্বর ২০২৫

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে এমন এক ঘটনা ঘটেছে, যা শুনলে সাধারণ মানুষও বুঝে যায়—এই সমাজে ক্ষুদ্র কারণও মুহূর্তে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। পাহাড়পুর ইউনিয়নের আওলিয়া বাজারে মাত্র একটি “হালকা ধাক্কা” থেকে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে একজন পরিশ্রমী অটোরিকশাচালক দেলোয়ার হোসেনের (৩৮–৪২) মৃত্যু দিয়ে। শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড স্থানীয়দের প্রতিটি হৃদয়ে ক্ষোভের আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, খাটিঙ্গা দক্ষিণপাড়া/চাঁনপুর গ্রামের দেলোয়ার—যাকে সবাই ‘দেলোয়ার মিয়া দিলু’ বলে চিনত—অত্যন্ত শান্ত, পরিশ্রমী মানুষ। তাঁর অটোরিকশা বাজারে ঢোকার সময় সামান্য স্পর্শ লাগে বিল্লাল মিয়ার (৫০) মোটরসাইকেলে। ধাক্কাটি এতটাই তুচ্ছ, বহু মানুষ তা চোখেও পড়েনি।

কিন্তু বিল্লাল মিয়া আচরণ করলেন এমনভাবে, যেন তার সামনে কোনো শত্রু দাঁড়িয়ে আছে। হাতে থাকা ভারী কাঠের রোল তুলে মুহূর্তেই আক্রমণ করেন দেলোয়ারের মাথা, কাঁধ ও বাহুতে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন—“বিল্লাল মিয়ার আঘাত দেখে মনে হচ্ছিল সে মারতেই উঠেছে।”

এক জায়গায় আঘাত নয়—বারবার, নির্দয়ভাবে।

দেলোয়ার ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন। বাজারের মানুষ ছুটে তাকে উদ্ধার করলেও, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তিনি পথেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে তার নিথর শরীর—একটি পরিবারের স্বপ্নগুলো সাথেই গেছে সেখানে।

দেলোয়ারের পরিবার এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
পিতা মৃত তোতা মিয়া—যিনি এলাকাবাসীর কাছে ‘তোতা চৌকিদার’ নামে পরিচিত ছিলেন।
স্ত্রী কাজল বেগম স্থানীয় গ্রাম পুলিশের সদস্য, কিন্তু নিজের স্বামীকে এভাবে হারানোর পর আজ তিনি শুধু একটাই কথা বলছেন—
“আমার স্বামী কারো কোনো ক্ষতি করেনি। আমার সন্তানদের ভবিষ্যৎ এখন কী হবে?”

অন্যদিকে অভিযুক্ত বিল্লাল মিয়া—কচুয়া মোড়া/শান্তামোড়া গ্রামের বাসিন্দা—ঘটনার পরপরই পালিয়ে গেছেন।
স্থানীয়রা বলছেন—
“বিল্লাল আগে থেকেই রগচটা স্বভাবের। নিজের দোকানের সামান্য বিষয় নিয়েও মানুষের সঙ্গে রাগারাগি করত।”

কিন্তু কেউই ভাবেনি, একদিন তার এই রাগ কারও জীবন কেড়ে নেবে।

বিজয়নগর থানার ওসি শহীদুল ইসলাম বলেন,
“ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করেই সংঘর্ষ। আমরা লাশ উদ্ধার করেছি। অভিযুক্তকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।”

তবে স্থানীয়দের বক্তব্য আরও কঠোর—
“এটা দুর্ঘটনা নয়, এটা খুন। যে মানুষ মাথায় লাঠি মারে, সে কীভাবে ভুল করে? এটা ঠান্ডা মাথার হামলা—এর শাস্তি হওয়া উচিত দৃষ্টান্তমূলক।”

আওলিয়া বাজারে মানুষের ক্ষোভ এখন তুফানের মতো।
বাজারের এক বৃদ্ধ দোকানি বলেন,
“আজ দেলোয়ার মরল, কাল তো আমি বা আপনি মরব! সামান্য ধাক্কায় হত্যা হলে সমাজে নিরাপত্তা থাকে কই?”

স্থানীয়রা জোর দাবি তুলেছেন—
বিল্লাল মিয়ার দ্রুত গ্রেফতার, দ্রুত বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে মানবিক সহায়তার দাবিও উঠছে ক্রমশ।
কারণ দেলোয়ার ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী।
তার মৃত্যুতে চলে আসবে
সন্তানদের শিক্ষার অনিশ্চয়তা,সংসারের ভরণ-পোষণের সংকট এবং স্ত্রী কাজল বেগমের মানসিক ধস।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন,
“এখনই দেলোয়ারের পরিবারকে সরকারি-বেসরকারি সহায়তা দিতে হবে। না হলে পরিবারটি দারিদ্র্যের অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জুড়ে রোড রেজ—অর্থাৎ সামান্য ঘটনায় হিংস্রতায় রূপ নেওয়া আচরণ—দিনে দিনে বাড়ছে।
সামাজিক নেতারা সতর্ক করে বলছেন—
“ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ শেখানো না গেলে গ্রামীণ সমাজে আরও হত্যাকাণ্ড ঘটবে।”

পুলিশ বলছে তদন্ত চলছে; কিন্তু জনমত আজ একটাই—
অপরাধীকে দ্রুত ধরো, দ্রুত বিচার দাও। দেলোয়ারের পরিবারের পাশে দাঁড়াও।

Please follow and like us:
0
fb-share-icon20
Tweet 20
Pin Share20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *