হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মানসিক রোগীর পরিচয় মিলল, ফিরলেন পরিবারের কাছে।

স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া:

নিখোঁজের ৩৪ দিন পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে সাত দিন চিকিৎসাধীন থাকা মানসিক রোগী আজিজুল রহমানের (৩৫) পরিচয় শনাক্ত হয়েছে।

পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় তাঁকে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের উদ্যোগে আজিজুল রহমানকে তাঁর বাবা আব্দুর কাদিরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় তাঁর চাচা সাবেক মেম্বার আমির হোসেন, আনার হোসেন ও মা বাসুনা বেগম উপস্থিত ছিলেন। পরে সিএনজিযোগে তাঁকে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার নিয়ামত কান্দি গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়।

আজিজুল কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার নিয়ামত কান্দি এলাকার আব্দুর কাদিরের ছেলে। তিনি অবিবাহিত এবং দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মানসিক অসুস্থতার কারণে তাঁকে অনেক সময় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হতো।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আজিজুল নিখোঁজ হন। দীর্ঘদিন বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত তাঁর ছবি দেখে পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করেন। এরপর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

হাসপাতাল পুলিশ ও উদ্ধারকারীদের সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার আখাউড়া-নারায়ণপুর সড়কে আহত অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে তাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অজ্ঞাত থাকায় তাঁর পরিবারের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। হাসপাতালের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা, খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই ব্যক্তি একপর্যায়ে তাঁর নাম ‘আজিজুল’, বাবার নাম ‘আব্দুর কাদের’ এবং গ্রামের নাম ‘নিয়ামত কান্দি’ বলে জানান। তবে তিনি এলোমেলো কথা বলায় তাঁর দেওয়া তথ্যের সত্যতা তখনই নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি দাবি করেছিলেন, তাঁকে কেউ মোটরসাইকেল থেকে ফেলে দিয়েছে। তবে এ বক্তব্যেরও সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। পরবর্তীতে বাতিঘরের ফেসবুকে প্রকাশিত ছবি দেখে পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করলে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হয়। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাঁকে তাঁর বাবা আব্দুর কাদিরের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
হস্তান্তরের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের পক্ষ থেকে আজিজুলের চিকিৎসা, খাবার ও ফল কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাঁকে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দিতে সিএনজির ব্যবস্থাও করা হয়।

নার্সিং ইনচার্জ তাহমিনা আক্তার বলেন, আজিজুল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর পরিচয় জানা যাচ্ছিল না। মানসিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় তাঁর কাছ থেকে সঠিক তথ্য পাওয়াও কঠিন ছিল। চিকিৎসক, নার্স ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের সমন্বিত সহযোগিতায় তাঁর চিকিৎসা ও দেখভাল করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সন্ধান পাওয়ায় তাঁকে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমরা আনন্দিত।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিঃ মোঃ আজহার উদ্দিন বলেন, অজ্ঞাত ও অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের মানবিক দায়িত্ব। আজিজুলের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে নিরাপদে স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, দীর্ঘ ৩৪ দিন পর একজন মানুষ তাঁর পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন, এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দ।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী বলেন, অজ্ঞাতপরিচয় রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজিজুলের ক্ষেত্রেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, নার্সিং টিম ও বাতিঘরের সহযোগিতায় তাঁর চিকিৎসা ও পরিচয় শনাক্তের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিবারের কাছে তাঁকে ফিরিয়ে দিতে পারা একটি মানবিক সাফল্য।

অবশেষে নিখোঁজ হওয়ার ৩৪ দিন পর এবং হাসপাতালে সাত দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর পরিবারের কাছে ফিরে গেলেন আজিজুল রহমান।

Please follow and like us:
0
fb-share-icon20
Tweet 20
Pin Share20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *